৪র্থ শিল্প বিপ্লবঃ Industry 4.0

Published by DIU CPC on

সর্বপ্রথম ১৭৮৪ সালে বাস্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে প্রথম শিল্প বিপ্লবের সুচনা ঘটে। ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মধ্যে দিয়ে পা দেয় দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবে এবং এরও প্রায় ১০০ বছর পরে এসে ইন্টারনেট আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তৃতীয় শিল্প বিপ্লব। বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার মানকে ১০০ বছর সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে যে বিপ্লব সেটিই হলো চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। এর আগে ঘটে যাওয়া তিনটি বিপ্লবই ছিলো মূলত যান্ত্রিক বিপ্লব। কিন্তু চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হচ্ছে ডিজিটাল বিপ্লব। বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুর হলেও এর পাশাপাশি আমরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের পূর্ণ সুবিধা ভোগ করছি। যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে করে তুলছে সহজ থেকে সহজতর। বিশ্বব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন একদিনে বিশ্বে ২০ হাজার ৭০০ কোটি ই-মেইল পাঠানো হয়, গুগলে ৪২০ কোটি বিভিন্ন বিষয় স¤পর্কে খোঁজ করা হয়। এক যুগ আগেও তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ পরিবর্তনগুলো ছিলো অকল্পনীয়। আগামী ১০ বছরেও ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে আমরা এমন ধরণের পরিবর্তনের সম্মুক্ষীন হবো যা বিগত অর্ধশতকে কল্পনাও করা হয়নি।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে “Industry 4.0” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের মতো নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যাবহারের ফলে বর্তমান শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আলোচিত প্রযুক্তি গুলো হচ্ছে মেশিন লার্নিং, আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংস, থ্রি-ডি প্রিন্টিং, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, উন্নত মানের রোবটিক্স সিস্টেম, ক্লাউড টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, নিত্য-নতুন ধরনের শক্তি। এসকল প্রযুক্তির সফল ও কার্যকরী ব্যবহার আমাদেরও জীবনযাত্রার মানকে সহজ তো করবেই, এর পাশাপাশি করবে আরও বেগবান। তবে রোবটিক্স ও অটোমেশন প্রযুক্তির কারণে বেড়ে যাবে চাকরির ঝুঁকি। ঝুকির তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র, এরপর ক্রমানুসারে ঝুঁকির তালিকায় থাকবে জার্মানি, ব্রিটেন ও জাপান।আপাত দৃষ্টিতে চাকরির বাজারের সংকোচন মনে হলেও, নানান ধরণের নতুন কর্মসংস্থানের বিশাল এক দুয়ার উন্মোচিত হবে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্যে লাগবে দক্ষ জনশক্তি।

এই শিল্প বিপ্লব যেমন অনেক সুফল বয়ে আনবে তেমনি মুখোমুখি হতে হবে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের। সব কিছুর আধুনিকায়নের ফলে আমাদেরও তথ্যগুলো ব্যাক্তিকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ না থেকে ভেসে বেড়াবে অনলাইনে। যার ফলে তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে জোড় দিতে হবে বেশি করে। ঠিক তেমনিভাবে অনলাইন মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও রক্ষা করতে হবে কঠোরভাবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিভিন্ন উৎপাদন শিল্প হয়ে পরবে প্রযুক্তি নির্ভর। তাই প্রযুক্তিগত কোনো সমস্যার ফলে ব্যাঘাত ঘটবে উৎপাদনে। ইন্টারনেট অব থিংস এর ব্যাবহারের ফলে এর সাথে স¤পর্কিত সব কিছু হয়ে পরবে ইন্টারনেট নির্ভর। তাই নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে এস¤পর্কিত কাজগুলো বাঁধাগ্রস্ত হবে। অটোমেশনের ফলে কলকারখানা গুলোতে মানুষের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বৃদ্ধি পাবে যন্ত্রের প্রতি নির্ভরশীলতা। শ্রমিকদের স্থান দখল করে নিবে মেকানিকাল আর্ম অথবা ইন্ড্রাস্টিয়াল রোবটেরা। এর ফলে বহু মানুষের কাজের সুযোগ কমে যাবে।

অটোমেশনের ফলে একদিকে যেমন কাজের সুযোগ কমবে অন্যদিকে নানান ধরণের ঝুঁকিপূণ কাজ যখন বিভিন্ন যন্ত্র দ্বারা সম্পাদিত  হবার ফলে কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকির পরিমান অনেকাংশে কমে যাবে। তেমনি ভাবে একজন মানুষের একটা কাজ করতে যে পরিমাণ সময় লাগতো একটি যন্ত্র তার চেয়ে কম সময়ে সেই কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে। যার ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। শিল্পের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতেও প্রযুক্তির ছোঁয়া বৃদ্ধি পাবে। নিত্য-নতুন প্রযুক্তির ব্যাবহারের মাধ্যমে অনেক জটিল অপারেশন সহজে করা সম্ভব হবে। এসকল সুযোগ সুবিধার ফলে সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব তরুণ প্রজন্মেও জন্যে নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হবার সম্ভাবনা প্রবল তেমনি কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি হবে। যারা নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে তারাই টিকে থাকতে পারবে। এবস্থায় আমাদের সকলের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে।

জীবনযাত্রার এ অগ্রযাত্রায় শিল্প বিপ্লবের ধারা এখানেই থেমে থাকবে না। তবে ভবিষ্যৎ এর শিল্প বিপ্লবগুলো বর্তমান সময়কার মতোও হবে না। আশা করা যায় আগত আগামী সকল শিল্প বিপ্লব পরিবেশ বান্ধব এবং প্রযুক্তির প্রয়োগে মানব কল্যাণে প্রভূত ভূমিকা রাখবে।

রাফিদুল হাসান
সিএসই ৫০ ব্যাচ, এ সেকশন


0 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *